02/04/2026 গণতন্ত্রের মহাপরীক্ষা, বাংলাদেশ ব্যালট বিপ্লবের অপেক্ষায় ১৮ কোটি মানুষ
নিজস্ব প্রতিবেদক
২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:৫৮
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। গত ১৫ বছরের রাজনৈতিক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি, জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী সংস্কার এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ, সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই নয়, বরং বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার এক নতুন পরীক্ষা।
ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে সুদূর উত্তরের সীমান্তঘেঁষা গ্রাম, সবখানেই আজ একটিই গুঞ্জন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি কী হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশক পর বাংলাদেশের মানুষ প্রথমবারের মতো একটি অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর নির্বাচনের ঘ্রাণ পাচ্ছে।
গত ১৫ বছর ধরে যে ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল, সেই ভোটার অধিকার ফিরে পাওয়ার এক প্রবল আকাঙ্ক্ষা এখন বাংলার প্রতিটি ঘরে।
এবারের নির্বাচনের মূল আকর্ষণ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বের নির্বাচনী প্রচারণা। ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন নির্বাচনী মাঠের কেন্দ্রবিন্দুতে। আল জাজিরার তথ্যমতে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ স্লোগানে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছে।
সিলেট থেকে শুরু করে খুলনা, প্রতিটি সমাবেশে লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করছে যে, জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন।
জামায়াত এবার একক শক্তিতে এবং কিছু এলাকায় জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করছে। দলটির দাবি, তারা এবার ভোট বিপ্লব ঘটাবে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। জরিপ বলছে, বিএনপির সমর্থনে প্রায় ৩৪.৭ শতাংশ এবং জামায়াতের সমর্থনে ৩৩.৬ শতাংশ ভোটার রয়েছেন।
নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যেই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আজ সোমবার এক বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত মোট ৬৬৩টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৫৩টিই সরাসরি হত্যা মামলা। টিআইবির প্রতিবেদন অনুসারে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মোট মামলা ৬৬৩টি এবং হত্যা মামলার সংখ্যা ৪৫৩টি।
সারাদেশে মোট অভিযুক্ত আসামি প্রায় ২.২৫ লক্ষ মানুষ। আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৪,০১৭টি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়েরকৃত অভিযোগ ৪৫০টি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর যে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেখানে স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। তবে ঢালাও মামলার সংস্কৃতি এবং তদন্তের ধীরগতি ন্যায়বিচারের পথে অন্তরায় হতে পারে।
উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে শেখ হাসানাকে জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।
বাংলাদেশের এবারের নির্বাচন কেবল দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দিল্লি, ইসলামাবাদ এবং বেইজিংয়ের নজরেও রয়েছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্য এবারের নির্বাচন একটি বড় কৌশলগত ধাক্কা। তবে ভারত এখন বাস্তববাদী অবস্থান নিচ্ছে। ভারতীয় হাই কমিশনার ইতিপূর্বে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের সাথে বৈঠক করেছেন। ভারত চায় বাংলাদেশে এমন একটি সরকার আসুক যারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের এক নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেছে। দীর্ঘ ১৪ বছর পর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হয়েছে এবং পাকিস্তান আইসিসিতে বাংলাদেশের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান একটি জামায়াত বা বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারকে নিজেদের জন্য অনুকূল মনে করছে। চীন বরাবরই ক্ষমতায় কে আছে তার চেয়ে বাণিজ্যে বেশি আগ্রহী। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চীন ড্রোন কারখানা তৈরি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে কয়েকশ কোটি ডলারের বিনিয়োগ করেছে।
বেইজিং জানিয়েছে, যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা বাংলাদেশের সাথে তাদের কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখবে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের বিশাল প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, পাকিস্তান থেকে জেএফ-১৭ থান্ডার এবং চীন থেকে জে-১০ সি যুদ্ধবিমান কেনা কিংবা তুরস্ক থেকে টি-১২৯ অ্যাটাক হেলিকপ্টার সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার চলমান অংশ।
তবে সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি, নতুন নির্বাচিত সরকারের হাতেই যেন দীর্ঘমেয়াদী এ বিশাল আর্থিক বোঝা বা চুক্তির ভার থাকে। মানুষ চায় এমন এক সরকার যারা পারিবারিক আত্মীয়করণ করবে না বরং জনগণের সম্পদ রক্ষা করবে। বিগত ১৫ বছরের রাতের ভোট, বিনা ভোটের নির্বাচন এবং নীল নকশার সংস্কৃতি থেকে বাংলার মানুষ মুক্তি চায়।
লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে, সেখানে একনায়কতন্ত্রের কোনো স্থান নেই। জনগণের সাধারণ বক্তব্য হলো, তারা দিনের ভোট দিনেই দিতে চায়। মানুষ এমন একটি স্বাধীন বাংলাদেশ চায় যেখানে কোনো দল তার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য নীল নকশা করবে না এবং সরকার যেন পারিবারিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হয়।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৬ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন এবং ৬২টি সহিংস সংঘর্ষের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী সংখ্যালঘুদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যবেক্ষক দল ইতিমধ্যেই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি ভোটের দিন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের মানুষের গত ১৫ বছরের জমানো ক্ষোভ এবং নতুন স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশের দিন। শেখ হাসিনার ৬৬৩টি মামলা আর বিপরীতে তারেক রহমান ও ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিশাল জনস্রোত, সবই নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশ এক নতুন রাজনৈতিক উচ্চতায় পৌঁছাতে চাইছে।
নতুন যে সরকারই আসুক না কেন, তাদের জন্য সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো ক্ষমতাকে জনগণের আমানত হিসেবে ব্যবহার করা, আত্মীয়করণ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়া এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সাহসী ভূমিকা পালন করা। বাংলার প্রতিটি মাঠ ঘাট আজ স্লোগানে মুখরিত। গণতন্ত্রের এ আনন্দ উল্লাস যেন ১২ ফেব্রুয়ারির পর আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়, এটাই ১৮ কোটি মানুষের প্রার্থনা।